বাংলাদেশের স্টার্টআপ অর্থায়ন ৯৫% কমেছে—তবু পুনরুদ্ধারের একটি সংকেত আছে

LightCastle Partners-এর প্রথমার্ধের বিনিয়োগ প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের স্টার্টআপ অর্থায়ন ২০২৫ সালের একই সময়ের ১২০ মিলিয়ন ডলার থেকে ৬ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে—বছরওয়ারি পতন ৯৫%; তবে ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধের তুলনায় অর্থায়ন ৫১% বেড়েছে এবং পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রথমার্ধের অবস্থান থেকে স্থিতিশীলতার প্রাথমিক সংকেত দিয়েছে।
Financial Express-এর তথ্যসারাংশে ছয়টি চুক্তির গড় আকার ১ মিলিয়ন ডলার, শীর্ষ তিন চুক্তিতে মোট মূলধনের ৮০%, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশ ১০০% এবং দেশীয় অংশগ্রহণ শূন্য দেখানো হয়েছে; খাতভিত্তিক হিসাবে সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি ৩৫%, আর্থিক সেবা ২৯%, স্বাস্থ্যসেবা ২৬% এবং প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোগ মোট অর্থের ৯০% পেয়েছে। সরাসরি উত্তর তাই দ্বিমুখী: অর্থায়ন বার্ষিক হিসাবে গভীরভাবে সংকুচিত, কিন্তু পরপর দুই অর্ধবছরের হিসাবে নিচু ভিত্তি থেকে কিছুটা ঘুরেছে; সেই উন্নতি এখনো অল্প কয়েকটি চুক্তি ও পুরোপুরি বিদেশি মূলধনের ওপর নির্ভরশীল।
দুই তুলনা কেন আলাদা ছবি দেখায়
বার্ষিক পতন এবং আগের অর্ধবছরের তুলনায় বৃদ্ধি পরস্পরবিরোধী নয়। প্রথমটি আগের বছরের অত্যন্ত উঁচু ভিত্তির সঙ্গে বর্তমান বাজারের দূরত্ব মাপে, আর দ্বিতীয়টি নিকটতম ছয় মাসের তুলনায় অর্থপ্রবাহ কোন দিকে গেছে তা দেখায়। বাজার কতটা সংকুচিত হয়েছে বুঝতে প্রথম তুলনা জরুরি; পতনের পর গতি আর কমছে কি না বুঝতে দ্বিতীয়টি বেশি কার্যকর।
আগের বছরের ভিত্তি একটি ব্যতিক্রমী বড় লেনদেনে ফুলে উঠেছিল। Dhaka Tribune-এর বিশদ হিসাবে SILQ-সংশ্লিষ্ট লেনদেনের মূল্য ছিল ১১০ মিলিয়ন ডলার; একই বিশ্লেষণে ২০১৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মোট ১.১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৮৭৯ মিলিয়ন ডলার বা ৮০% পরবর্তী পর্যায়ের চুক্তিতে যাওয়ার এবং সেই অর্থের ৯৮% বিদেশি উৎস থেকে আসার তথ্য রয়েছে। ফলে বড় লেনদেনটির পুনরাবৃত্তি না হওয়া বার্ষিক পতনকে তীব্র করেছে, কিন্তু সেটি বর্তমান অর্থায়নের দুর্বলতা মুছে দেয় না।
গড় চেকের অঙ্কও সতর্কভাবে পড়তে হবে। মোট অর্থকে চুক্তির সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে যে গড় পাওয়া যায়, সেটি একটি সাধারণ স্টার্টআপ কত অর্থ পেয়েছে তা বোঝায় না। বড় তিন চুক্তি মোট মূলধনের অধিকাংশ নিয়ে নেওয়ায় বাকি কোম্পানিগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতা গড়ের চেয়ে অনেক ছোট হতে পারে। মধ্যম চেকের অঙ্ক প্রকাশিত না থাকায় বাজারের মাঝামাঝি চুক্তির প্রকৃত আকারও নির্ধারণ করা যায় না।
অর্ধবার্ষিক বৃদ্ধি কেন পুনরুদ্ধারের সংকেত

নিকটতম অর্ধবছরের তুলনায় বৃদ্ধি অন্তত এটুকু দেখায় যে প্রকাশিত অর্থায়নের মোট অঙ্ক আরও নিচে নামেনি। দীর্ঘ পতনের পরে দিক বদলের জন্য এটি প্রয়োজনীয় সংকেত, বিশেষ করে যখন নতুন অর্থের বড় অংশ প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোগে গেছে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা সম্পূর্ণভাবে বাজার ছেড়ে যায়নি এবং নতুন কোম্পানির জন্য কিছু অর্থায়ন কার্যক্রম চালু আছে।
তবে এটিকে পূর্ণ পুনরুদ্ধার বলার মতো বিস্তার নেই। মোট অর্থের বড় অংশ কয়েকটি চুক্তিতে কেন্দ্রীভূত হলে একটি বড় রাউন্ড যোগ বা বাদ পড়লেই অর্ধবার্ষিক ফল দ্রুত বদলে যেতে পারে। শক্তিশালী পুনরুদ্ধারে মোট ডলারের পাশাপাশি চুক্তির সংখ্যা, শীর্ষ চুক্তির বাইরে অর্থের বণ্টন এবং প্রাথমিক পর্যায় থেকে পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার ধারাবাহিকতা বাড়ার কথা।
এখানে সময়সীমাও গুরুত্বপূর্ণ। একটি অর্ধবছরের উন্নতি দিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখায়, স্থায়ী প্রবণতা নয়। পরবর্তী কয়েকটি প্রতিবেদনে একই সঙ্গে বেশি কোম্পানি, বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগকারী এবং একাধিক পর্যায়ের চুক্তি দেখা গেলে বর্তমান সংকেতের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে।
কোন খাত অর্থ পেয়েছে
সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি সবচেয়ে বড় অংশ পেয়েছে; এর পরেই রয়েছে আর্থিক সেবা ও স্বাস্থ্যসেবা। লজিস্টিকস ও মোবিলিটিতেও অর্থ গেছে, তবে অংশ তুলনামূলক ছোট। এই বণ্টন দেখায় যে মূলধন একটিমাত্র শিল্পে পুরোপুরি আটকে ছিল না, যদিও মোট বাজার ছোট হওয়ায় কয়েকটি চুক্তিই খাতগুলোর অবস্থান নির্ধারণ করেছে।
সফটওয়্যার ও প্রযুক্তির শীর্ষ অবস্থানকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি খাতগত পরিবর্তন বলা যাবে না। স্বল্পসংখ্যক চুক্তির বাজারে একটি বড় সিড রাউন্ড বা অনুদান কোনো খাতের অংশ দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। একই কারণে আর্থিক সেবার অংশ কমে যাওয়া সেই খাতে বিনিয়োগকারীর আগ্রহ স্থায়ীভাবে শেষ হওয়ার প্রমাণ নয়; আগের সময়ের বড় লেনদেন বাদ পড়ার প্রভাবও এতে রয়েছে।
প্রতিষ্ঠাতা বা বিনিয়োগকারীর জন্য খাতভিত্তিক শতাংশের চেয়ে চুক্তির গঠন বেশি অর্থবহ। অর্থটি অনুদান, সিড, প্রি-সিরিজ এ কিংবা পরবর্তী পর্যায়ের রাউন্ড—কোন পথে এসেছে, তা কোম্পানির পরবর্তী মূলধন সংগ্রহের সুযোগ সম্পর্কে বেশি স্পষ্ট ধারণা দেয়। বর্তমান বণ্টনে প্রাথমিক পর্যায়ের আধিপত্য নতুন উদ্যোগের জন্য কিছু দরজা খোলা থাকার ইঙ্গিত দিলেও স্কেল-আপ অর্থায়নের ঘাটতি বহাল আছে।
দেশীয় মূলধনের অনুপস্থিতি কেন মূল দুর্বলতা

প্রতিবেদনাধীন সময়ে দেশীয় বিনিয়োগ না থাকা বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সীমা। বিদেশি তহবিল নতুন দক্ষতা, নেটওয়ার্ক ও বড় চেক আনতে পারে, কিন্তু সেটিই যদি একমাত্র উৎস হয়, তবে বৈশ্বিক বিনিয়োগ অগ্রাধিকার বদলালে স্থানীয় বাজারে বিকল্প অর্থের পথ থাকে না। মুদ্রা, নিয়ন্ত্রণ, প্রস্থান-সুযোগ বা আন্তর্জাতিক তহবিলের খাতগত পছন্দ বদলালেও বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো সরাসরি প্রভাবিত হয়।
এই দুর্বলতা পরবর্তী পর্যায়ে আরও প্রকট। প্রাথমিক চেক পাওয়া কোনো উদ্যোগ পণ্য তৈরি ও প্রাথমিক বাজার যাচাই করতে পারে, কিন্তু বড় পরিসরে নিয়োগ, অবকাঠামো বা আঞ্চলিক সম্প্রসারণের জন্য বড় রাউন্ড প্রয়োজন হয়। দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক মূলধন না থাকলে সফল কোম্পানিও সেই পর্যায়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য হতে পারে।
ঘোষিত তহবিল, নীতিগত প্রণোদনা বা নতুন বিনিয়োগ কাঠামো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সম্পন্ন দেশীয় চুক্তিই পরিবর্তনের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হবে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীর উপস্থিতি শুধু মোট অর্থ বাড়ায় না; বিদেশি বিনিয়োগকারীর সঙ্গে সহ-বিনিয়োগ, ধারাবাহিক রাউন্ড এবং বাজারের ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতাও তৈরি করে।
পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে সঠিক পাঠ
বর্তমান উপাত্তকে ‘ঘুরে দাঁড়ানো শুরু’ বলা যায়, ‘বাজার ফিরে এসেছে’ বলা যায় না। ইতিবাচক দিক হলো, নিকটতম অর্ধবছরের তুলনায় অর্থায়ন বেড়েছে এবং একাধিক খাতে প্রাথমিক পর্যায়ের কার্যক্রম রয়েছে। নেতিবাচক দিক হলো, মোট অঙ্ক অত্যন্ত নিচু, মূলধন কয়েকটি চুক্তিতে কেন্দ্রীভূত এবং দেশীয় অংশগ্রহণ নেই।
পরবর্তী প্রতিবেদনে তিনটি পরিবর্তন বর্তমান সংকেতকে শক্তিশালী করবে: বড় চুক্তির বাইরেও অর্থের বিস্তার, প্রাথমিক পর্যায়ের কোম্পানির পরবর্তী রাউন্ডে অগ্রগতি এবং দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের বাস্তব উপস্থিতি। এগুলো না ঘটলে মোট অর্থায়নের সাময়িক বৃদ্ধি একটি বা দুটি চুক্তির প্রভাবেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। বাংলাদেশের স্টার্টআপ বাজারে তাই পুনরুদ্ধারের লক্ষণ আছে, কিন্তু সেটি এখনো সংকীর্ণ, ভঙ্গুর এবং বিদেশি পুঁজিনির্ভর।
আমাদের নিউজলেটার নিন
সর্বশেষ Web3, AI ও ক্রিপ্টো সংবাদ সরাসরি আপনার ইনবক্সে পান।