প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন

শনির দক্ষিণ মেরুতে ১০ কোণের ঢেউ—উত্তরের ষড়ভুজ আর একা নয়

|লেখক: QUASA সম্পাদকীয় দল|4 মিনিটের পাঠ| 1
শনির দক্ষিণ মেরুতে ১০ কোণের ঢেউ—উত্তরের ষড়ভুজ আর একা নয়

শনির দক্ষিণ মেরু ঘিরে একটি বিশাল, বিকাশমান ১০ কোণের বায়ুমণ্ডলীয় ঢেউ শনাক্ত করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত NASA-এর Hubble প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি শনির দক্ষিণ গোলার্ধে দেখা প্রথম বড়, নিয়মিত বাহুবিশিষ্ট জেট-প্যাটার্ন; ২০২৩–২০২৫ সালের ছবিতে গঠনটি ক্রমে স্পষ্ট হয়েছে এবং একাধিক বায়ুমণ্ডলীয় স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত।

এটি মেঘের ওপর স্থির কোনো জ্যামিতিক রেখা নয়। শনির একটি শক্তিশালী জেট স্ট্রিমে আটকে থাকা বায়ুমণ্ডলীয় তরঙ্গ এঁকেবেঁকে দশটি বাহু ও কোণের মতো সীমা তৈরি করেছে। প্রকাশিত পর্যবেক্ষণ থেকে গঠনটির উপস্থিতি নিশ্চিত হলেও এটি উত্তরের দীর্ঘস্থায়ী ষড়ভুজের মতো স্থায়ী হবে কি না, এখনই বলা যাচ্ছে না।

২০২৩ সালের ছবি থেকে কীভাবে দশভুজটি শনাক্ত হলো

২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের পর্যবেক্ষণে শনির দক্ষিণ মেরুর তরঙ্গটি দশ কোণে স্পষ্ট হয়ে ওঠা

আবিষ্কারটি কোনো একটি ছবির ফল নয়; কয়েক বছরের পর্যবেক্ষণ পাশাপাশি রাখার পর এর বিকাশ ধরা পড়েছে। Hubble-এর Outer Planet Atmospheres Legacy বা OPAL কর্মসূচি এক দশকের বেশি সময় ধরে বাইরের গ্রহগুলোর বার্ষিক ছবি সংগ্রহ করছে। সেই আর্কাইভে ফিরে গিয়ে গবেষকেরা ২০২৩ সালের Hubble ডেটাতেও দক্ষিণ মেরুর তরঙ্গটির ক্ষীণ চিহ্ন পান।

অনুসন্ধানের সূত্র এসেছিল ভূমিভিত্তিক পর্যবেক্ষণ থেকে। ESA/Hubble-এর প্রকাশিত সময়রেখায় বলা হয়েছে, Agustín Sánchez-Lavega এবং অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী Trevor Barry ও Jean-Paul Oger ২০২৪ সালের ছবিতে দক্ষিণ মেরু বরাবর একটি সূক্ষ্ম ঢেউখেলানো বলয় লক্ষ করেন; ২০২৫ সালের ছবিতে ইঙ্গিতটি জোরালো হওয়ার পর Hubble ডেটা পরীক্ষা করে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।

শনির ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে দক্ষিণ মেরু পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে ভালোভাবে দৃশ্যমান হওয়ায় পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। Cassini মহাকাশযান ২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত শনিকে প্রদক্ষিণ করলেও তার ছবিতে দীর্ঘস্থায়ী দক্ষিণী বহুভুজের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাই দশভুজটি ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তৈরি হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু পর্যবেক্ষণের ফাঁকের কারণে এর জন্মের নির্দিষ্ট সময় এখনো অজানা।

এ কারণেই এখানে ‘নতুন’ কথাটির সীমা গুরুত্বপূর্ণ। গঠনটি ঠিক ২০২৩ সালেই তৈরি হয়েছে—এমন প্রমাণ নেই; নিশ্চিতভাবে বলা যায়, Cassini যুগে দীর্ঘস্থায়ী রূপে এটি দেখা যায়নি, আর Hubble-এর ২০২৩ সালের ছবিতে এর উপস্থিতি এখন শনাক্ত করা গেছে। পরের দুই বছরের পর্যবেক্ষণে নকশাটি আরও পরিষ্কার হয়েছে।

বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য উল্লম্ব বিস্তার দেখিয়েছে

ভিন্ন উচ্চতার বায়ুমণ্ডলীয় স্তরে শনির দক্ষিণী দশভুজের সামান্য স্থানান্তর

Hubble একই অঞ্চলকে আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে দেখেছে, যেগুলো শনির মেঘ ও কুয়াশার ভিন্ন ভিন্ন উচ্চতা প্রকাশ করে। এসব ছবিতে দশভুজটির আপাত অবস্থান সামান্য বদলাতে দেখা যায়। গবেষকদের ব্যাখ্যায়, এই স্থানান্তর দেখায় যে তরঙ্গটি শুধু দৃশ্যমান মেঘের ওপরের ক্ষণস্থায়ী নকশা নয়; এর কাঠামো বায়ুমণ্ডলের একাধিক স্তর জুড়ে উল্লম্বভাবে বিস্তৃত।

‘দশভুজ’ নামটি আকৃতিটির পর্যবেক্ষণভিত্তিক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। এখানে কোনো কঠিন বাহু বা প্রান্ত নেই: জেট স্ট্রিমের গতিপথ বারবার বাঁক নেওয়ায় ওপর থেকে মেঘের সীমানা কয়েকটি প্রায় সোজা অংশ ও কোণ হিসেবে দেখা যায়। মেঘ ও কুয়াশার উজ্জ্বলতার পার্থক্য তরঙ্গটিকে দৃশ্যমান করে, অথচ গ্যাস সেই সীমানার মধ্যেই প্রবাহিত হতে থাকে।

২০২৩ সালের ক্ষীণ চিহ্ন থেকে পরের বছরগুলোতে স্পষ্টতর নকশা পাওয়া যাওয়ায় গবেষকেরা একে বিকাশমান বায়ুমণ্ডলীয় গঠন হিসেবে বর্ণনা করছেন। তবে দৃশ্যমানতা বেড়েছে বলেই যে এটি স্থিতিশীল হয়ে গেছে, তা নয়। পর্যবেক্ষণের সময় দক্ষিণ মেরুর দেখার অনুকূলতা বদলেছে—এই জ্যামিতিক প্রভাবও ছবির ব্যাখ্যায় বিবেচ্য।

উত্তরের ষড়ভুজ থেকে এটি যেভাবে আলাদা

শনির উত্তরের স্থায়ী ষড়ভুজ ও দক্ষিণের বিকাশমান দশভুজের তুলনা

দুই মেরুর গঠনের মৌলিক মিল হলো, উভয়টিই শক্তিশালী জেট স্ট্রিমে তৈরি গ্রহব্যাপী বায়ুমণ্ডলীয় তরঙ্গ। কিন্তু উত্তরের ষড়ভুজ উপযুক্ত প্রতিটি পর্যবেক্ষণে ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে দেখা গেছে, যেখানে দক্ষিণের দশভুজের নিশ্চিত ছবির ইতিহাস আপাতত ২০২৩–২০২৫ সালেই সীমিত। এই সময়ের ব্যবধানের কারণে দক্ষিণের গঠনটিকে এখনই উত্তরটির সমান স্থায়ী বলা যায় না।

চলনের ধরন ও আকারেও পার্থক্য আছে। Associated Press-এর প্রতিবেদনে গবেষণার ফল উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, উত্তরের ষড়ভুজ প্রায় স্থির থাকলেও দক্ষিণের দশভুজ পূর্বদিকে ঘণ্টায় প্রায় ১০ কিলোমিটার সরে যায়; দশভুজটির একটি বাহুর দৈর্ঘ্য ১৬,৭০০ কিলোমিটারের বেশি।

অতএব দক্ষিণের গঠনটি উত্তরের ষড়ভুজের হুবহু প্রতিরূপ নয়। এর বাহু বেশি, এটি জেটের তুলনায় সরে যাচ্ছে এবং এখনো বিকাশমান বলে মনে হচ্ছে। একই গ্রহের দুই মেরুতে কাছাকাছি ধরনের জেট কেন ছয় ও দশ বাহুর আলাদা তরঙ্গ তৈরি করে, সেটিই আবিষ্কারটির প্রধান বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন।

শিরোনামের ‘উত্তরের ষড়ভুজ আর একা নয়’ কথাটির অর্থও এখানেই সীমিত: শনির বায়ুমণ্ডলে এখন দুই মেরুতেই বড় বহুভুজাকার তরঙ্গ পর্যবেক্ষিত হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে দুই গঠনের উৎপত্তি, স্থায়িত্ব বা গতিবিদ্যা একই। মাত্র দুটি উদাহরণ থেকে কোন পরিস্থিতিতে বাহুর সংখ্যা ছয় বা দশ হয়, তার নিশ্চিত নিয়মও এখনো পাওয়া যায়নি।

দশভুজটি স্থায়ী হবে কি না, তা এখনো অমীমাংসিত

বর্তমান ছবিগুলো দশভুজটির অস্তিত্ব ও বহু স্তরে বিস্তার নিশ্চিত করে, কিন্তু এর ভবিষ্যৎ নয়। এটি আরও সুসংগঠিত হয়ে উত্তরের ষড়ভুজের মতো দীর্ঘস্থায়ী বিন্যাসে পৌঁছাতে পারে, আবার পরিবর্তিত হতে থাকতেও পারে। কয়েক বছরের ডেটা দিয়ে কয়েক দশকের স্থায়িত্ব অনুমান করা সম্ভব নয়।

পরবর্তী পর্যবেক্ষণে গবেষকেরা দেখবেন তরঙ্গটির কোণ, গতি ও উল্লম্ব কাঠামো একই থাকে কি না। Hubble ও James Webb Space Telescope-এর ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের সঙ্গে কম্পিউটার মডেল মিলিয়ে মেঘ, কুয়াশা, বাতাস ও তাপমাত্রার ত্রিমাত্রিক বিন্যাস বোঝার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে কোন বায়ুগতীয় প্রক্রিয়া তরঙ্গটি তৈরি করেছে এবং দক্ষিণ মেরুর ঋতুগত পরিবর্তনের ভূমিকা আছে কি না, তা পরীক্ষা করা সম্ভব হবে।

এখন পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্ত তাই সংক্ষিপ্ত: শনির দক্ষিণ মেরুতে একটি ১০ বাহুবিশিষ্ট, বহু স্তরে বিস্তৃত বায়ুমণ্ডলীয় তরঙ্গ আছে এবং ২০২৩–২০২৫ সালের পর্যবেক্ষণে সেটি স্পষ্টতর হয়েছে। উত্তরের ষড়ভুজ আর শনির একমাত্র বড় বহুভুজাকার মেরু-তরঙ্গ নয়; তবে দক্ষিণের দশভুজ সাময়িক ঘটনা, নাকি দীর্ঘস্থায়ী সঙ্গী—তার উত্তর ভবিষ্যতের ছবিই দেবে।

শেয়ার করুন:

আমাদের নিউজলেটার নিন

সর্বশেষ Web3, AI ও ক্রিপ্টো সংবাদ সরাসরি আপনার ইনবক্সে পান।

0