বাংলাদেশের AI নীতি এখনো খসড়া—মানব পর্যালোচনার অধিকার কতটা বাস্তব

|লেখক: QUASA সম্পাদকীয় দল|5 মিনিটের পাঠ| 1
বাংলাদেশের AI নীতি এখনো খসড়া—মানব পর্যালোচনার অধিকার কতটা বাস্তব

বাংলাদেশের জাতীয় AI নীতির খসড়ায় চাকরি, ঋণ বা সরকারি সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চাওয়া, আপত্তি জানানো এবং মানুষের মাধ্যমে পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব আছে। সেই মানব পর্যালোচনা এখনো খসড়ার ভিত্তিতে আইনগতভাবে দাবি করার অধিকার নয়: বাংলাদেশের AI নীতির আইনি অবস্থার মূল্যায়নে সংশোধিত খসড়াকেও বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে গণ্য করা হয়নি। ব্যক্তিগত উপাত্ত ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পৃথক উপাত্ত সুরক্ষা আইনের অধিকার প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ১৪ জানুয়ারি ২০২৬-এর সরকারি নোটিশে জাতীয় নীতির খসড়া প্রকাশ করে; পরে সংশোধিত সংস্করণও আসে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে মানব পর্যালোচনার অনুরোধ করা যায়, কিন্তু শুধু নীতির প্রস্তাব দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তা দিতে বাধ্য—এমন দাবি করা যায় না। প্রতিষ্ঠানটি কোন আইন, সেবার নিয়ম বা নিজস্ব আপিল পদ্ধতির অধীনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বর্তমান প্রতিকারের প্রশ্নে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

খসড়ায় মানব পর্যালোচনার পরিধি

সরকারি নীতি খসড়ার অধিকারসংক্রান্ত অংশে এমন AI ব্যবস্থার কথা আছে, যা কোনো ব্যক্তির ওপর আইনি বা উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে এমন সিদ্ধান্ত নেয় অথবা সিদ্ধান্তকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রের নিয়োগ, ঋণ, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় সেবা এর উদাহরণ। তাই কোনো কর্মকর্তা AI-এর সুপারিশ অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নিলেও প্রস্তাবিত সুরক্ষার প্রশ্ন উঠতে পারে; কেবল সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের মধ্যেই বিষয়টি সীমিত নয়।

প্রস্তাব অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ফলটি বুঝতে ও চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। মানুষের পর্যালোচনা বলতে এমন একজন যোগ্য সিদ্ধান্তগ্রহণকারীর কাছে বিষয়টি তোলা বোঝায়, যাঁর আগের ফল পুনর্মূল্যায়ন, বদলানো বা বাতিল করার ক্ষমতা আছে। উচ্চ প্রভাবের সিদ্ধান্তে প্রধান কারণের পাশাপাশি কোন প্রাসঙ্গিক তথ্য ভিন্ন হলে ফল বদলাতে পারত, তার বোধগম্য ব্যাখ্যার কথাও রয়েছে। এগুলো ভবিষ্যৎ কাঠামোর ভাষা; বর্তমানে সব নিয়োগকারী, ঋণদাতা বা সরকারি দপ্তরের ওপর আরোপিত সাধারণ AI নিয়ম নয়।

কোনটি প্রস্তাব, কোনটি বর্তমান দায়িত্ব

বাংলাদেশের খসড়া AI নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবার সিদ্ধান্ত মানুষের মাধ্যমে পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব

খসড়ার বিধানগুলোকে বিদ্যমান আইনের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে নাগরিকের অধিকার এবং AI ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট হয়। বিশেষ করে পুরো সিদ্ধান্ত মানুষের মাধ্যমে পুনর্বিবেচনা এবং সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত ব্যক্তিগত উপাত্ত সম্পর্কে তথ্য পাওয়া আলাদা বিষয়।

  • মানব পর্যালোচনা: প্রস্তাব হলো উল্লেখযোগ্য প্রভাবের স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগে ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের কাছে পুনর্বিবেচনার সুযোগ। শুধু নীতি খসড়া থেকে বর্তমানে এমন সর্বজনীন দায়িত্ব তৈরি হয়নি। কোন প্রভাবকে ‘উল্লেখযোগ্য’ বলা হবে, আপত্তির জবাব কত দ্রুত দিতে হবে এবং পর্যালোচনা চলার সময় সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে কি না—এসবের প্রয়োগপদ্ধতি এখনো স্থির নয়।
  • প্রভাব মূল্যায়ন: উল্লেখযোগ্য সরকারি AI ব্যবস্থা এবং বেসরকারি খাতের উচ্চ ঝুঁকির ব্যবস্থার ক্ষেত্রে চালুর আগে গোপনীয়তা, বৈষম্য, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য প্রভাব যাচাইয়ের প্রস্তাব আছে। নীতি খসড়া নিজে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই নির্দিষ্ট মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে না। কোন ব্যবস্থাকে উচ্চ ঝুঁকির ধরা হবে, মূল্যায়ন কে দেখবে এবং কতটা প্রকাশ করা হবে, তা ভবিষ্যৎ নিয়ম ও তদারকির ওপর নির্ভর করবে।
  • প্রতিকার: AI-জনিত ক্ষতির অভিযোগ, দায় নির্ধারণ ও উপযুক্ত ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিকার পাওয়া যাবে কি না, তা ক্ষতির ধরন এবং প্রযোজ্য উপাত্ত, শ্রম, ভোক্তা বা প্রশাসনিক আইনের ওপর নির্ভর করে; সিদ্ধান্তে AI ব্যবহৃত হয়েছে বলেই খসড়ার ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব কার্যকর হয় না। অভিযোগের তদন্তে কোন নথি লাগবে এবং দায় কার ওপর পড়বে, সেটিও ভবিষ্যৎ কাঠামোর বিষয়।
  • তদারকি: খসড়ায় স্বাধীন কমিটি দিয়ে AI ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ, নিরীক্ষা ও ঝুঁকির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাবিত কমিটিকে নাগরিকের অভিযোগ নিষ্পত্তির বিদ্যমান কর্তৃপক্ষ ধরে নেওয়া যায় না। তার আইনি ক্ষমতা, নিয়োগপদ্ধতি এবং অন্য নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক নির্ধারণ করতে আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।

ব্যক্তিগত উপাত্তের ক্ষেত্রে এখন কী অধিকার আছে

AI নীতি খসড়া হলেও ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ পৃথক আইন; এর প্রবেশাধিকার ও সংশোধনসংক্রান্ত বিধান কার্যকর। উপাত্তধারী লিখিতভাবে উপাত্ত-জিম্মাদারের কাছে নিজের প্রক্রিয়াকৃত ব্যক্তিগত উপাত্ত চাইতে পারেন। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সেই তথ্যের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের যুক্তি ও তাৎপর্যের বর্ণনা রয়েছে। অশুদ্ধ বা বিভ্রান্তিকর উপাত্ত সংশোধন এবং অসম্পূর্ণ উপাত্ত পূরণের অনুরোধের সুযোগও আছে।

আইনটি ব্যক্তিগত উপাত্তসম্পর্কিত স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের জন্য দেওয়া সম্মতি প্রত্যাহারের কথাও বলে। তবে সম্মতি প্রত্যাহার মানেই আগে নেওয়া সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়া নয়। একইভাবে উপাত্তে প্রবেশাধিকার বা সিদ্ধান্তের যুক্তি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার অধিকার পুরো ঋণ, চাকরি কিংবা সুবিধার সিদ্ধান্ত নতুন করে একজন মানুষ দিয়ে বিচার করানোর সাধারণ অধিকার দেয় না। সিদ্ধান্তটি যদি ব্যক্তিগত উপাত্তের বদলে অন্য তথ্য বা নিয়মের ওপর দাঁড়ায়, উপাত্ত আইনের দাবি দিয়েও সেই পুরো বিরোধ নিষ্পত্তি করা যাবে না।

আইনের অভিযোগ, প্রশাসনিক জরিমানা ও ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত কয়েকটি ধারা কার্যকর করার জন্য পরবর্তী গেজেট প্রজ্ঞাপনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাই উপাত্ত-জিম্মাদারের কাছে সরাসরি লিখিত অনুরোধ এবং নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রতিকারকে একই পর্যায়ের উপলব্ধ পথ ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। প্রতিষ্ঠান তথ্য সংশোধনের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে লিখিত কারণ চাওয়ার বিধান আছে; ব্যক্তিগত উপাত্ত নিয়ে বিরোধটি তাতে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব।

সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কোন পথে যাবেন

ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইনে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত তথ্য জানার ও ভুল তথ্য সংশোধনের অধিকার

প্রথমে সিদ্ধান্তদাতা প্রতিষ্ঠান বা দপ্তরের কাছে লিখিতভাবে সিদ্ধান্তের কারণ, ব্যবহৃত ব্যক্তিগত উপাত্ত এবং ভুল তথ্য সংশোধনের পথ জানতে চান। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার পুনর্বিবেচনাও চাইতে পারেন, তবে সেই অনুরোধের ভিত্তি হিসেবে নীতি খসড়াকে কার্যকর আইন বলবেন না। আবেদন, প্রত্যাখ্যানের বার্তা ও সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ সংরক্ষণ করলে কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি করছেন এবং কোন তথ্য ভুল বলে মনে করছেন, তা নির্দিষ্ট রাখা সহজ হয়।

সরকারি সেবা বা সামাজিক সুরক্ষা ভাতার বিষয়ে নাগরিক অভিযোগ দাখিলের সরকারি ফরমে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সেবা বেছে অভিযোগ জানানোর এবং প্রমাণ যুক্ত করার ব্যবস্থা আছে। এটি সেবাসংক্রান্ত অভিযোগের পথ; প্রস্তাবিত স্বাধীন AI আপিল ব্যবস্থা নয়। ফরমটির নিয়ম অনুযায়ী, আইন বা বিধিতে কোনো বিষয়ে আলাদা রিভিউ বা আপিলের সুযোগ থাকলে সেই বিষয়ে এখানে অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। বেসরকারি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রথম লিখিত অনুরোধটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছেই যাবে; পরবর্তী পথ নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত ও প্রযোজ্য খাতভিত্তিক নিয়মের ওপর।

আইনি অধিকার হওয়ার পথ কোথায়

নীতি খসড়ায় AI সংক্রান্ত আইন, দায় নির্ধারণ এবং স্বাধীন তদারকির জন্য সংসদীয় ভিত্তির পথ রাখা হয়েছে। কিন্তু নীতির প্রস্তাব, সংসদে উত্থাপিত বিল এবং পাস হয়ে কার্যকর হওয়া আইন ভিন্ন ধাপ। মানব পর্যালোচনার অধিকার শেষ পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্তে প্রযোজ্য হবে, প্রতিষ্ঠান কীভাবে আপত্তি নিষ্পত্তি করবে এবং আদেশ না মানলে কী প্রতিকার মিলবে—এসব চূড়ান্ত আইনি বিধানের ওপর নির্ভর করবে। তার আগে ব্যক্তিগত উপাত্তের বিষয়ে বিদ্যমান আইন এবং সংশ্লিষ্ট সেবা বা খাতের অভিযোগপদ্ধতিই নির্দিষ্ট দাবির ভিত্তি।

আরও পড়ুন:

শেয়ার করুন:

আমাদের নিউজলেটার নিন

সর্বশেষ Web3, AI ও ক্রিপ্টো সংবাদ সরাসরি আপনার ইনবক্সে পান।

0