
বাংলাদেশে BIN আবেদন বিনামূল্যে—অসম্পূর্ণ তথ্যেই দেরি

বাংলাদেশে ব্যবসার BIN পেতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনলাইন পোর্টালে মূসক-২.১ পূরণ করে আবেদন করতে হয়। এনবিআরের নিবন্ধন নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদন বিনামূল্যে; সঠিক তথ্য দিলে প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য বিলম্ব কমে। আবেদন বিনামূল্যে হলেও ব্যবসাটি নিবন্ধন বা তালিকাভুক্তির যোগ্য কি না, তা আগে নির্ধারণ করতে হবে।
শুরুতে ব্যবসার প্রযোজ্য টার্নওভার হিসাব করে মূসক নিবন্ধন, টার্নওভার কর তালিকাভুক্তি বা স্বেচ্ছায় নিবন্ধনের পথ বেছে নিন। তারপর প্রতিষ্ঠানের টিআইএন, ঠিকানা, যোগাযোগের তথ্য, ব্যাংক হিসাব ও কার্যক্রমের বিবরণ নিয়ে ফর্ম পূরণ করুন। আবেদন আটকে গেলে প্রথমে জমা দেওয়া তথ্যের ঘাটতি এবং এক ঘরের সঙ্গে অন্য ঘরের অমিল দেখুন।
টার্নওভার অনুযায়ী কোন পথটি প্রযোজ্য
BIN হলো ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর; মূসক নিবন্ধন ও টার্নওভার কর তালিকাভুক্তির সনদে এটি থাকে। হালনাগাদ মূসক আইনে প্রতি ১২ মাসে তালিকাভুক্তির সীমা ৩০ লাখ টাকা এবং নিবন্ধনের সীমা ৫০ লাখ টাকা। সীমা হিসাবের টার্নওভারে অব্যাহতিপ্রাপ্ত সরবরাহ ও মূলধনী সম্পদ বিক্রির মতো নির্দিষ্ট মূল্য ধরা হয় না; তাই মোট ব্যাংক জমা বা সব বিক্রির অঙ্কই সরাসরি এই হিসাব নয়।
- প্রযোজ্য টার্নওভার ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে শুধু টার্নওভারের কারণে টার্নওভার কর তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক হয় না। প্রয়োজন হলে স্বেচ্ছায় নিবন্ধনের সুযোগ এবং ব্যবসার কার্যক্রমভিত্তিক বাধ্যবাধকতা আলাদাভাবে দেখুন।
- প্রযোজ্য টার্নওভার ৩০ লাখ টাকার বেশি, কিন্তু ৫০ লাখ টাকার বেশি নয়—এমন ব্যবসার জন্য টার্নওভার কর তালিকাভুক্তির পথ প্রযোজ্য। ফর্মে মূসক নিবন্ধন ও তালিকাভুক্তির বিকল্প আলাদা, তাই শুধু BIN পাওয়ার উদ্দেশ্যে ভুল বিকল্প নির্বাচন করবেন না।
- প্রযোজ্য টার্নওভার ৫০ লাখ টাকা অতিক্রম করলে মূসক নিবন্ধনের পথ প্রযোজ্য। নতুন ব্যবসার ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত টার্নওভার নিবন্ধনসীমা ছাড়াবে কি না, তা হিসাব করতে হবে।
দোকান, অনলাইন বিক্রয় বা সেবা—বিক্রির মাধ্যম দিয়ে একা নিবন্ধনের ধরন স্থির হয় না। আমদানি-রপ্তানি, দরপত্রের কাজ কিংবা সম্পূরক শুল্ক প্রযোজ্য পণ্য বা সেবার মতো কার্যক্রমে টার্নওভার কম হলেও নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। ব্যবসার একাধিক শাখা থাকলে কেবল একটি শাখার বিক্রি ধরে পুরো প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নির্ধারণ করা ঠিক হবে না।
মূসক-২.১ খোলার আগে যে তথ্য গুছিয়ে নেবেন
এনবিআরের মূসক-২.১ ফর্মে টিআইএন, নিবন্ধনপ্রার্থীর নাম, নিবন্ধিত অফিস ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শাখার ঠিকানা, যোগাযোগের ব্যক্তি, ব্যাংক হিসাব, প্রত্যাশিত বার্ষিক টার্নওভার এবং ব্যবসার কার্যক্রম চাওয়া হয়েছে। ফর্মটি ২০১৬ সালের হওয়ায় তার মুদ্রিত নির্দেশনায় পুরোনো ৮০ লাখ টাকার নিবন্ধনসীমা আছে; সীমা বেছে নেওয়ার সময় হালনাগাদ আইনের ৫০ লাখ টাকার অঙ্ক ব্যবহার করুন। অসম্পূর্ণ আবেদন প্রক্রিয়ায় দেরি করতে পারে বা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে—ফর্মের নির্দেশনায় এ সতর্কতাও রয়েছে।
- পরিচয় ও আইনি ধরন: একক মালিকানায় মালিকের টিআইএন, আর কোম্পানি বা অংশীদারি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের টিআইএন প্রস্তুত রাখুন। মালিক, অংশীদার বা পরিচালকের তথ্য এবং আবেদনকারীর ঘোষণায় যে ব্যক্তির পরিচয় লাগবে, সেটিও মিলিয়ে নিন। প্রতিষ্ঠানের নামের বানান যেন টিআইএন ও অন্য ব্যবসায়িক তথ্যে ব্যবহৃত নামের সঙ্গে মেলে।
- ঠিকানা ও যোগাযোগ: নিবন্ধিত অফিসের পূর্ণ ঠিকানা, পোস্ট কোড, মোবাইল নম্বর ও সচল ইমেইল লিখে রাখুন। কেন্দ্রীয় নিবন্ধনের আওতায় একাধিক শাখা থাকলে প্রতিটির ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য আলাদা করে সাজান। যোগাযোগের ব্যক্তির নাম ও ভূমিকা আগে স্থির করলে আবেদন জমার পর তথ্য জানতে যোগাযোগ করা সহজ হয়।
- ব্যাংক ও বিক্রির হিসাব: ব্যবসার ব্যাংক হিসাবের নাম, নম্বর, ব্যাংক ও শাখার তথ্য প্রস্তুত রাখুন। চলমান ব্যবসার বিক্রির হিসাব থেকে প্রযোজ্য টার্নওভার নির্ণয় করুন; নতুন উদ্যোগে প্রত্যাশিত বার্ষিক টার্নওভারের যুক্তিসংগত হিসাব করুন। নির্বাচিত নিবন্ধনের ধরন ও ফর্মে লেখা অঙ্ক যেন পরস্পরবিরোধী না হয়।
- কাজের প্রকৃতি: পণ্য উৎপাদন, খুচরা বা পাইকারি বিক্রি, সেবা, আমদানি কিংবা রপ্তানির মধ্যে যা প্রযোজ্য, তা নির্দিষ্ট করুন। শুধু ‘ব্যবসায়ী’ বা ‘সেবাদাতা’ লিখে থামবেন না; কী পণ্য সরবরাহ করেন বা কোন সেবা দেন, তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করুন। ব্যবসার জায়গা ভাড়া হলে ফর্মে চাওয়া ভাড়াসংক্রান্ত তথ্যও প্রস্তুত রাখুন।
তথ্য প্রস্তুত রাখা আর প্রতিটি নথি আপলোড করা এক বিষয় নয়। পোর্টাল যে ঘর বা সহায়ক তথ্য চাইবে, সেটি অনুযায়ী উত্তর দিন; আগেই সব কাগজের ছবি জমা দিতে হবে ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। একাধিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম থাকলে একটিকে লিখে বাকিগুলো বাদ দিলে আবেদন ব্যবসার প্রকৃত পরিসর দেখাবে না।
পোর্টালে আবেদন জমা দেওয়ার ক্রম
- এনবিআরের ওয়েবসাইট থেকে অনলাইন মূসক নিবন্ধনের পোর্টালে যান। নিবন্ধন বা তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনকারীর নামে ব্যবহারকারী হিসাব খুলুন; হিসাব থাকলে সেটিতে প্রবেশ করুন।
- নিবন্ধন অংশে মূসক-২.১ নির্বাচন করে ব্যবসার টার্নওভার ও কার্যক্রম অনুযায়ী মূসক নিবন্ধন অথবা টার্নওভার কর তালিকাভুক্তি বেছে নিন। কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ও শাখার ঘর থাকলে ব্যবসার প্রকৃত কাঠামো অনুযায়ী পূরণ করুন।
- পরিচয়, ঠিকানা, যোগাযোগ, ব্যাংক হিসাব, প্রত্যাশিত টার্নওভার এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ঘর পূরণ করুন। ঘোষণার অংশে আবেদনকারী ব্যক্তির পরিচয় ও ভূমিকা সঠিকভাবে লিখুন।
- জমা দেওয়ার আগে পূরণ করা তথ্য আবার মিলিয়ে আবেদন পাঠান। জমার রেফারেন্স বা প্রাপ্তিসংক্রান্ত তথ্য থাকলে সংরক্ষণ করুন এবং পোর্টালের অবস্থা ও নিবন্ধিত ইমেইল দেখুন। সনদ তৈরি হলে সিস্টেম থেকে সংগ্রহ করুন।
অনলাইন পোর্টালে ঘরের নাম বা ক্রম মুদ্রিত ফর্মের সঙ্গে পুরোপুরি না-ও মিলতে পারে। প্রতিটি ঘরে কী তথ্য চাওয়া হচ্ছে, সেটি পড়ে উত্তর দিন; কোনো ঘর অনুমান করে পূরণ করলে পরে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। আবেদন পাঠানোর আগে বিশেষ করে নিবন্ধনের ধরন, টিআইএন এবং প্রত্যাশিত টার্নওভার পাশাপাশি দেখে নেওয়া উপকারী।
আবেদন আটকে গেলে কোথায় অমিল খুঁজবেন
জমা দেওয়ার পর সংশোধন বা অতিরিক্ত তথ্যের বার্তা এলে বার্তায় চাওয়া নির্দিষ্ট ঘরটি আগে দেখুন। বার্তা না থাকলেও পোর্টালে আবেদন সম্পূর্ণ জমা হয়েছে কি না এবং সঠিক ইমেইলে যোগাযোগ যাচ্ছে কি না যাচাই করুন। দেরির কারণ না জেনে একই তথ্য দিয়ে আরেকটি আবেদন শুরু করলে মূল অমিলটি থেকেই যায়।
- প্রতিষ্ঠানের আইনি ধরন অনুযায়ী মালিকের টিআইএন না প্রতিষ্ঠানের টিআইএন দেওয়া উচিত, তা মিলিয়ে দেখুন। ঘোষণায় দেওয়া ব্যক্তির নাম ও ভূমিকা পরিচয় অংশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না দেখুন।
- নিবন্ধিত অফিসের ঠিকানা, পোস্ট কোড এবং শাখার তথ্য বাদ পড়েছে কি না দেখুন। একই ঠিকানা একাধিক ঘরে লিখলে তার বানান ও অবস্থানের বিবরণ যেন আলাদা না হয়।
- প্রত্যাশিত টার্নওভার নির্বাচিত মূসক নিবন্ধন বা তালিকাভুক্তির বিকল্পের সঙ্গে মেলে কি না দেখুন। পুরোনো মুদ্রিত ফর্মের সীমা অনুসরণ করে বিকল্প বেছে থাকলে হালনাগাদ সীমা অনুযায়ী সেটি সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
- ব্যবসার কার্যক্রমের বর্ণনা যথেষ্ট নির্দিষ্ট কি না এবং যোগাযোগের মোবাইল ও ইমেইল সচল কি না দেখুন। অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া হলে অনুমানভিত্তিক উত্তর না দিয়ে ব্যবসার প্রকৃত তথ্য দিন।
আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে প্রদর্শিত কারণ ধরে তথ্য সংশোধন করুন। কারণ বোঝা না গেলে আবেদন রেফারেন্সসহ সংশ্লিষ্ট মূসক অফিস বা এনবিআরের সেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। সনদ পাওয়ার পর সেখানে প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা ও BIN আবেদনকালে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে রাখুন।
আরও পড়ুন:
সম্পর্কিত নিবন্ধ


Udyam নিবন্ধন বিনামূল্যে—Aadhaar ও PAN দিয়েই শুরু

বাংলাদেশে private limited company—নাম ছাড়পত্রের ৩০ দিন নষ্ট করবেন না

Typeform না Jotform—১০ বনাম ১০০ উত্তরেই ফ্রি plan-এর সীমা ধরা পড়ে

Tally না Google Forms—ফ্রি হলেও পেমেন্ট ও sign-in-এ ফল বদলায়

Google Forms না Microsoft Forms—৫ লাখ বনাম ৫০ লাখ উত্তরের সীমা
আমাদের নিউজলেটার নিন
সর্বশেষ Web3, AI ও ক্রিপ্টো সংবাদ সরাসরি আপনার ইনবক্সে পান।